প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা

প্রকাশিতঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ আপডেটঃ ১১:৩১ অপরাহ্ণ

প্রতিটি শিশুই তার নিজের জীবন ও সমাজ জীবনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার অধিকার নিয়ে জন্মায়। শিশু সময়ের সাথে সাথে তার বুদ্ধিমত্তা বিকাশের কারণে সমাজ জীবনে কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে। একজন সুস্থ স্বাভাবিক শিশুর জন্য ব্যাপারটি সহজ হলেও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অতোটা সহজ নয়। সহজ নয় এই কারণেই যে এসব শিশুরা স্বাভাবিক আচরণ ও সুযোগ সুবিধা তেমন লাভ করতে পারে না বা সুযোগ পায় না। এমনিতেই প্রাপ্তবয়স্করা যেসব মৌলিক মানবাধিকার ভোগ করে থাকে সেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ লোকের কিছু জ্ঞান বা ধারণা থাকলেও এমন অনেক লোক রয়েছে যাদের কাছে শিশু অধিকার ব্যাপারটি একেবারে নতুন। আর এ রকম পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্যাপারটা আরও করুন। অধিকাংশ লোকের কাছে এরা সমাজ সংসারের বোঝা ও চরম অবহেলার পাত্র হয়ে থাকে।

কিন্তু বাস্তবে এ ধারণা একদম ভুল। তাদের প্রতি সমাজের সকল মানুষের সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। তাদের সঙ্গে অন্য দশটি শিশুর মতোই সহজ স্বাভাবিক আচরণ করাও প্রয়োজন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ২৩ ধারায় এই নীতি পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে, প্রতিবন্ধী শিশুদের এমন পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে হবে যা তাদের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল ও সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে। এই ধারাতে তাদের বিশেষ তত্ত্বাবধানের অধিকারও স্বীকার করা হয়েছে।

সনদ অনুমোদনকারী রাষ্ট্রসমূহ এই অঙ্গীকার করেছে যে তাদের সম্পদ অনুযায়ী এ ধরনের শিশু ও তাদের মা বাবাকে চিকিৎসা সেবা, পুনর্বাসন সেবা, বিশেষ শিক্ষা, চাকরির প্রশিক্ষণ বা কারিগরি শিক্ষা এবং বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। সম্ভব হলে বিনামূল্যে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। এর উদ্দেশ্য হল সমাজের সঙ্গে শিশুদের যতোটা সম্ভব পরিপুর্ণভাবে অঙ্গীভূত হবার ও ব্যক্তিগত বিকাশ অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা।

সাধারণত শারীরিক ও মানসিক এ দু’ধরনের প্রতিবন্ধী শিশু আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজে। প্রতিবন্ধী শিশুরা সাধারণত স্বাভাবিক শিশুদের থেকে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকে। তবে পূর্ণমাত্রায় সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেলে তারাও একটি স্বাভাবিক শিশুর মতো সমাজে বেড়ে উঠতে পারে। সাধারণ মানুষের মতো সমাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। এমন নজির সমাজে অনেক রয়েছে। তার এমন একটি উদাহরণ হল প্রতিবন্ধী সাফ গেমসে অংশগ্রহণ করে আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী সোনার শিশুদের বিভিন্ন গেমসএ স্বর্ণ পদকসহ বিভিন্ন পদক অর্জন। আন্তরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশুদের সহজভাবে শিক্ষাপ্রদান করলে এসব শিশুরা একটি স্বাভাবিক শিশুর মতোই সকলক্ষেত্রে তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম। প্রতিবন্ধী শিশুদের সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হল শিক্ষার পাশাপাশি তাদের কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। যাতে এসব শিশুদের অন্যের মুখাপেক্ষী হতে না হয়। অবশ্য প্রতিবন্ধী এসব শিশুদের কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ রেখে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায় থেকেই বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এ সকল সংস্থা শিশুদের প্রতিবন্ধীত্বের ধরন বুঝে তাদের সেই ধরনের কারিগরি শিক্ষাদান করে থাকে।

একজন মানুষ হিসেবে প্রতিবন্ধী শিশুদের সমাজ ও দেশে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য আন্তরিক সহমর্মিতা একান্ত প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় সে সব দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য অত্যধিক গুরুত্ব সহকারে তাদের সুস্থ ও পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রদানের লক্ষ্যে একটি সুশৃঙ্খল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। যার ফলে একটি প্রতিবন্ধী শিশু তার জীবনের প্রথম থেকেই সুন্দর একটি জীবনের দেখা পায় এবং শিশুটির অভিভাবকরা থাকেন দুশ্চিন্তামুক্ত। তাদের শিক্ষাদানসহ উন্নত কারিগরি শিক্ষা প্রদানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। এসব শিশুদের সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য রয়েছে সব ধরনের ব্যবস্থা ও সুযোগ।

একটি শিশু বিভিন্ন কারণে প্রতিবন্ধী হতে পারে তা বলে এই নয় যে সে সমাজ ও দেশ থেকে শুধু করুণা ও সাহায্য নিয়ে যাবে। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর মতো সেও বেড়ে উঠতে পারে, দেশ ও জাতীর কাছে রাখতে পারে তার অবদান। এজন্য শুধু দরকার আমাদের সকলের সুদৃষ্টি এবং সহমর্মিতা। দরকার তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। এমনিতেই আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী শিশুদের অবস্থান ভালো নয়। আমরা যদি তাদের জন্য এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেই তবে তাদের অবস্থান আরও বেশি শোচনীয় অবস্থায় চলে যাবে।

খালিদ বিন আনিস (পরিবর্তন ডটকম ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬)