প্রযুক্তির অভাবেই অপরাধ

প্রকাশিতঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ আপডেটঃ ৯:৩২ অপরাহ্ণ

কার্যকর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) বুথে অপরাধ বাড়ছে। বেশির ভাগ বুথের ভেতরে-বাইরে নিরাপত্তা নাজুক। এর সুযোগ নিচ্ছে দেশি-বিদেশি অপরাধীরা। এই পরিপ্রেক্ষিতে বুথের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কার্যকর নিরাপত্তা ও পরিবীক্ষণের (মনিটরিং) অভাবে এটিএম কার্ডের প্রতিরূপ (ক্লোন) তৈরি করে জালিয়াতি হয়, বুথগুলোর নিরাপত্তা শিথিল থাকে, সিসিক্যামেরা অকেজো থাকে; বুথে অনেক সময় জাল টাকাও পাওয়া যায়। কার্ড ক্লোন করে জালিয়াতির পেছনে ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) শাখার কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির পর কার্ড ক্লোন করে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনায় সম্প্রতি চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তাতে বলা হয়েছে, বেসরকারি চারটি ব্যাংকের চারটি এটিএম বুথ থেকে ৩৬ জন গ্রাহকের মোট ২০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াতচক্র। ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) সবচেয়ে বেশি টাকা চুরি হয়। ব্যাংকটির ২৪ জন গ্রাহকের মোট ১৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা খোয়া যায়। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংকের চারটি কার্ডের মাধ্যমে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) সাতটি কার্ডের মাধ্যমে এক লাখ ২৬ হাজার টাকা এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) একটি কার্ডের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ৬-১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজধানীর গুলশান, মিরপুরের কালশী ও বনানী এলাকার এটিএম বুথে এসব ঘটনা ঘটে। ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তাদের সংগঠন সিটিও ফোরামের সভাপতি তপন কান্তি সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটিএম বুথের বাহ্যিক নিরাপত্তা নাজুক। গার্ডদের উচিত কোনো কার্ডধারী বুথে ঢুকলে তার ওপর কড়া নজর রাখা। এটিএমের ভেতরে-বাইরে দুটি ক্যামেরা থাকে। তবে এগুলো যথেষ্ট নয়। অনেক দেশে চোখ স্ক্যানিং করা হয়, বায়োমেট্রিক এটিএম ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি। বিদেশে মাল্টিফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অপরাধ কম হয়। আমরা সনাতন প্রযুক্তির কার্ড ব্যবহার করছি, যা এখনো চিপনির্ভর নয়। কার্ডের নিরাপত্তা গলদও কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা।’ তপন কান্তি বলেন, এটিএম কার্ড চিপনির্ভর হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তখন আর অ্যান্টি স্কিমিং ডিভাইস লাগবে না। অনেক দেশে কার্ডধারীরা ইনস্যুরেন্সের আওতায় থাকে, ফলে আর্থিক ক্ষতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কম্পানি পাশে দাঁড়ায়।

প্রসঙ্গত, গত দুই দশকে এটিএম বুথের ব্যবহার ও পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের সাত হাজার বুথে বছরে লেনদেন হয় প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। কিছু বুথ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায়। কিছু বুথে টাকা জমা দেওয়া যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯৯ সালে এটিএম বুথের মাধ্যমে লেনদেন ছিল ৭০ কোটি টাকা। ২০০১ সালে লেনদেন ছিল ২১১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে লেনদেন হয় ৬৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। বুথগুলোর ৯৫.১৬ শতাংশ শহর এলাকায় এবং ৪.৮৪ শতাংশ গ্রাম এলাকায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা তোলা হয়। এরপর বেশি হয় সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাতে অনিরাপদ হয়ে পড়ে এটিএম বুথগুলো। নিরাপত্তাকর্মীরাই তখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাঁদের কাছে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম নেই। সময় কাটানোর উপায় না পেয়ে প্রায় সময়ই রক্ষীরা ঘুমিয়ে পড়েন।

সূত্র জানায়, জালিয়াতচক্র রাতের বেলাতেই এটিএম বুথের সিপিইউ থেকে গ্রাহক তথ্য চুরি করে। এরপর তারা ক্লোন কার্ড তৈরি করে। অনেক সময় কার্ডধারীরা ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। বড় বিপত্তি ঘটে তখনই। ছিনতাইকারীরা কার্ডের মালিককে জিম্মি করে বুথ থেকে টাকা তুলে নেয়। জালিয়াতচক্র পাসওয়ার্ড ও পিনকোড চুরি করতে এটিএম বুথে উচ্চ ক্ষমতার ক্যামেরা বসায়; সাধারণত রাতের বেলায় এটা করে। রাতে বেশির ভাগ লেনদেন হওয়ায় এটিএম বুথে অপরাধের হার বেশি বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠান ওয়ানস্টপ বিজনেস সলিউশন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ সাদি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এটিএম বুথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেন্ট্রাল মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। ব্যাংক কর্মকর্তাদের জড়িত হওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। শর্ষের মধ্যে যে ভূত তাকে তাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তিনি বলেন, তিন স্তরের প্রযুক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, দ্রুত টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করতে হবে, বিদ্যমান বুথগুলোকে প্রযুক্তিতে আরো উন্নত করতে হবে এবং এটিএম কার্ডকে চিপনির্ভর করতে হবে।

এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে বুথ থেকে টাকা চুরি ঠেকাতে সব তফসিলি ব্যাংককে বুথে অ্যান্টি স্কিমিং ডিভাইস স্থাপন, স্বচ্ছ গ্লাস ব্যবহার, পাসওয়ার্ডের অভেদ্যতা বাড়ানো, ফ্রন্ট ক্যামেরার মাধ্যমে অ্যালার্মের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্ড ডিভিশনের প্রধানদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অবশ্য এখনো বেশির ভাগ বুথে এসব নির্দেশনা কার্যকর করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সারা দেশে সাড়ে সাত হাজার এটিএম বুথ রয়েছে। ৯০ লাখ কার্ডধারী রয়েছে। গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় তৎপর।

 

মাসুদ রুমী (কালের কণ্ঠ ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)